প্রচ্ছদ

নীরব ঘাতক : নোমোফোবিয়া

০৩ জুন ২০১৯, ০১:৪৫

শুভ প্রতিদিন

দেবাশীষ রায় :
সহকারী অধ্যাপক, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, সিলেট।

অতিরিক্ত স্মার্টফোন আসক্তি নোমোফোবিয়া নামে পরিচিত যা অতিরিক্ত ইন্টারনেট ব্যবহার বা ইন্টারনেট আসক্তির মাধ্যমে তৈরি হয়। “No Mobile Phobia” শব্দটির সংক্ষিপ্তরূপ Nomophobia শব্দ।

তবে শুধুমাত্র স্মার্টফোনই এই আসক্তির জন্য দায়ী নয় বরং এর জন্য দায়ী করা যায় ইন্টারনেট গেমস, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপস এবং ইন্টারনেটের ভার্চুয়াল জগত কে।

যদিও স্মার্টফোন একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ডিভাইস, যা ছাড়া আমরা একদিনও চলতে পারি না এর মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার আমাদের কর্মস্থলে, পড়ালেখা এবং পারস্পরিক সম্পর্ককে বিঘ্নিত করতে পারে। যখন কেউ একজন স্মার্টফোনের মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়া অথবা গেম খেলার জন্য অতিরিক্ত সময় ব্যয় করে তখন সে বাস্তব জীবন এবং বাস্তব মানুষ থেকে অনেকটাই দূরে সরে পড়ে।

আজকাল অনেককেই দেখা যায় একটু পর পর পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে চেক করছে নতুন কোনো নোটিফিকেশন, মেসে্জ অথবা আপডেট আছে কিনা। এই ধরনের বারবার মোবাইল ফোন চেক করার টা যখন অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজঅর্ডারে পরিণত হয় তখন তাকে বলা হয় নোমোফোবিয়া।স্মার্ট ফোন সত্যিই বিশ্বটাকে আমাদের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। তবে তা হাতের নাগালের আপনজন ও পৃথিবীটাকে অনেক দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।

সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি গবেষণা পরিচালনা করা হয় যেখানে তাদের স্মার্টফোনের মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের সময় এবং তাদের মানসিক অবস্থার সম্পর্ক বের করা হয়।

গবেষণার ফলাফলে দেখা যায় যেসব শিক্ষার্থী বেশি সময় ধরে স্মার্ট ফোন, সোশ্যাল মিডিয়া-ফেইসবুক ব্যবহার করে তাদের মধ্যে বিষন্নতা, অবসাদ এবং ঈর্ষার পরিমাণ বেড়ে যায়। যদিও আমেরিকান ডায়াগনস্টিক এন্ড স্ট্যাটিস্টিকাল ম্যানুয়াল অফ মেন্টাল ডিসঅর্ডার মাত্রাতিরিক্ত স্মার্ট ফোন ব্যবহার কে এখনো আসক্তি হিসেবে আখ্যা দেয় নি তবে তারা এই অতিরিক্ত স্মার্ট ফোন ব্যবহার কে তুলনা করেছে জুয়া আসক্তি সাথে।

কখন বুঝবেন আপনি স্মার্টফোনে আসক্ত?

বার বার চেষ্টা করা সত্ত্বেও আপনি মোবাইল ফোন না ধরে থাকতে পারেন না, স্মার্ট ফোন ঘাটতে গিয়ে আপনি সময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন, যখন স্মার্ট ফোন ব্যবহার করতে গিয়ে আপনি আপনার চাকরি অথবা সম্পর্ককে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন, কোন কারনে আপনার ফোনে চার্জ অথবা ইন্টারনেট সেবা না থাকলে আপনি প্রচন্ড রেগে যান, বিরক্ত অনুভব করেন, অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন। যদি এই লক্ষণগুলো নিজের মধ্যে অথবা আপনার কোন প্রিয়জনের মধ্যে আপনি দেখেন ধরে নেন আপনি অথবা আপনার প্রিয় জন নোমোফোবিয়া আক্রান্ত।

আপনি কি ধরনের শারীরিক সমস্যায় পরতে পারেন?

২ ঘণ্টার বেশি সময় ডিজিটাল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখে ব্যথা ও অস্বস্তি অনুভূত হতে পারে।

চোখে জ্বালাপোড়া, ঘোলা দেখা, চুলকানো এমনকি মাথা ব্যাথা পর্যন্ত হতে পারে। দীর্ঘক্ষণ মাথা নিচু করে স্মার্টফোনের দিকে তাকিয়ে থাকার কারণে ব্যথা হতে পারে আপনার ঘাড়েও, যে ব্যথা ‘টেক্সট নেক’ নামে পরিচিত।

বেশ কিছু গবেষণায় দেখা যায় স্মার্টফোনের বিকিরণ পুরুষের প্রজনন ক্ষমতা কে বিঘ্নিত করে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার অন্যতম কারণ হচ্ছে অসচেতন ভাবে স্মার্ট ফোন ব্যবহার করা। অতি সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হাটা রত অবস্থায় স্মার্ট ফোন ব্যবহার করলে জরিমানা করা হচ্ছে।

স্মার্ট ফোন ব্যবহার করতে করতে অন্যমনস্ক ভাবে ছাদ থেকে পড়ে যাওয়া, ট্রেনের নিচে কাটা পড়া্, সড়ক দুর্ঘটনায় পড়া এরকম অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে আমাদের দেশে।গাড়ি চলন্ত অবস্থায় যদি কোন চালক স্মার্ট ফোন ব্যবহার করেন তাকে গবেষকরা তুলনা করেছেন নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানোর সাথে।

অতিরিক্ত স্মার্টফোনের ব্যবহার আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। স্মার্টফোনে আসক্তি নিদ্রাহীনতা বাড়ায়। অনেকেই ঘুমোতে যাওয়ার আগে স্মার্ট ফোন ব্যবহার করে থাকেন। তখন মানুষ নির্ধারিত এবং প্রয়োজনীয় সময় এর থেকে কম সময় ঘুমায়।

তাছাড়া স্মার্টফোনের এই আসক্তির কারণে আমাদের অফলাইন সম্পর্ক গুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয় অনলাইন সম্পর্ক ও ভার্চুয়াল পারসোনালিটির দ্বারা।

গবেষণা বলছে, একবিংশ শতাব্দীতে স্মার্টফোন আসক্তি হচ্ছে সবচেয়ে বড় নেশা যা মানুষ তথা সমাজের সামগ্রিক কর্মক্ষমতা কে হ্রাস করছে।

গবেষণাটি আরো জানায়, একজন গড়পড়তা মানুষ দৈনিক ২,৬১৭ বার তার মোবাইল ফোন স্পর্শ করেন।

আরেক গবেষনায় অ্যাপল জানায় যে আইফোন ব্যবহারকারীরা ২৪ ঘন্টা প্রায় ৮০ বার তাদের ফোন আনলক করে। বোঝাই যাচ্ছে আমরা দিন দিন কিভাবে আসক্ত হয়ে পড়ছি।

মোবাইল ফোন আসক্তি একদিনে দূর করা সম্ভব নয়, তার জন্য দরকার প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস ও আত্মনিয়ন্ত্রণ।

সবচেয়ে ভাল পদ্ধতি হচ্ছে মোবাইল ফোনের নোটিফিকেশন সেটিং চেঞ্জ করে নেয়া। মোবাইল ফোনে কোন নোটিফিকেশন সাউন্ড শোনার পর পরই আমাদের মনের ভিতর চলতে থাকে এক প্রবল কৌতুহল। তাই নোটিফিকেশন সাউন্ড অফ করে রাখলে অথবা ভলিউম কমিয়ে রাখলে মোবাইল আসক্তি থেকে অনেকটাই রেহাই পাওয়া যেতে পারে।

আর একটি কার্যকরী উপায় হল মোবাইল ফোনটিকে নিজের কাছ থেকে অনেকটা দূরে রাখা। তাছাড়া আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে সময় কাটান্ বই পড়া ইত্যাদি আপনাকে রক্ষা করতে পারে মোবাইল ফোনের অতি আসক্তি থেকে।

সুফল পেতে পারেন মেডিটেশনের মাধ্যমেও। তবে মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি জন্য অবশ্যই মনোবিদের পরামর্শ নেয়া উচিত।