প্রচ্ছদ

সিলেটে ঐতিহ্যবাহী ‘লাকড়ি তোড়ার উৎসব’ ও কিছু কথা

২৯ জুন ২০১৯, ১৯:৪৯

শুভ প্রতিদিন

আব্দুল করিম কিম :
নাকাড়ার ধ্বনিতে কুচকাওয়াজের ভঙ্গিমায় প্রস্তুত হাজার হাজার শাহজালাল ভক্ত। নাঙা তলোয়ার ও কুড়াল হাতে সাত’শ বছরের ঐতিহ্যকে স্মরণের প্রস্তুতি। এ কোন শরিয়তি অনুষ্ঠান নয়, জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিষেশে শাহজালাল ভক্তদের এ এক লৌকিক উৎসব। আজ ৩০ জুন রবিবার সিলেটে দেশের অন্যতম প্রাচিন লোকায়ত উৎসব ‘লাকড়ি তোড়ার মিছিল’। শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও আভিজাত্যের গৌরব ধ্বংসের শিক্ষা নিয়ে প্রায় সাত’শ বছর ধরে সিলেটে এ উৎসব উদযাপিত হয়ে আসছে।

প্রাচ্যের অন্যতম সুফি সাধক সুলতানে বাঙ্গাল হজরত শাহজালাল(রহ)-এর স্মৃতি বিজড়িত এ উৎসব প্রতি হিজরী বর্ষের ২৬শে শাওয়াল আড়ম্বরের সাথে উদযাপন করা হয়। এ উৎসব উপলক্ষ্যে দরগা-ই-হজরত শাজালাল প্রাঙ্গন থেকে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে হাজার হাজার শাহজালাল ভক্তের বর্ণাঢ্য মিছিল লাক্কাতোড়া চা বাগানের নির্দিষ্ট পাহাড়ের দিকে ছুটে যায় । সেখান থেকে সংগ্রহ করা হয় প্রতীকী লাকড়ি। ঝোপঝাড়ের কেটে নেয়া সে লাকড়ি কাঁধে নিয়ে ভক্তরা পুনরায় দরগা প্রাঙ্গণে ফিরে আসে। নির্ধারিত স্থানে জমা করা হয় সে লাকড়ি। যা এ উৎসবের ২১ দিন পর অনুষ্ঠিতব্য হজরত শাহজালাল (রহ)-এর বার্ষিক উরশ শরীফের শিন্নী রান্নায় ব্যাবহার করা হয়। প্রায় সাত শ বছর ধরে চিরাচরিত প্রথায় এ উৎসব পালন হয়ে আসছে।

প্রতি বছর ২৬ শাওয়াল জোহর নামাজ শেষ হতেই বেজে ওঠে ঐতিহ্যবাহী ‘নাকাড়া’। ‘শাহজালাল বাবা কী জয়’, ‘৩৬০ আউলিয়া কী জয়,’ ‘লালে লাল শাহজালাল’ স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে সিলেট নগর। নাঙা তলোয়ার, দা-কুড়াল ও লাল-ঝা-া হাতে হাজার হাজার শাহজালাল ভক্ত সকাল থেকেই খন্ড খন্ড মিছিল নিয়ে শহরের বিভিন্ন প্রান্ত দিয়ে শাহজালাল দরগা প্রাঙ্গণে জমায়েত হতে থাকে। কেউ একা আসে, কেউ আসে প্রতিবেশী আশেকানদের সাথে। বিভিন্ন মাজার-খানকা ও গঞ্জ-গ্রাম থেকে দুপুরের নামাজ পর্যন্ত চলে ভক্তদের জমায়েতপর্ব। জোহরের নামাজ শেষ হতেই শত বছরের প্রাচীন ঐতিয্যবাহী ‘নাকাড়া’ বেজে ওঠে। বেজে ওঠে ভক্ত-আশেকানদের শত শত ঢোল-ডঙ্কা ।

বিভিন্ন কাফেলার সাথে আসা অসংখ্য ব্যন্ড-পার্টির বাদ্যের তালে তালে চলে হাজার মানুষের স্লোগানে স্লোগানে নগ্ন পায়ে ছুটে চলা বেশির ভাগ মানুষের অঙ্গে থাকে লাল কাপড়। অনেকেই মাথায় লালপট্টি বাঁধে। এই মিছিল ছুটে চলে হজরত শাহজালাল(রহ.) এর ঐতিহ্যবাহী লাকড়ি তোড়া বা লাকড়ি ভাঙ্গার উৎসবে। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়া এ মিছিলের শুরু যখন গন্তব্যে পৌঁছে তখনো এর শেষ অংশ থাকে দরগা প্রাঙ্গণে। কোনো প্রচার-প্রচারণা ছাড়া প্রতি বছর বিশ থেকে ত্রিশ হাজার মানুষের জমায়েত হয়। পূণ্য লাভের মূলা ঝোলানো মাইকিং নেই, উদ্ভোধক নেই, প্রধান অতিথি নেই, এক মুষ্টি ডাল-চালের খিচুরী ছাড়া পেট চুক্তি কোনো খাবারও নেই; তবুও প্রতি বছর এই জনপদের সব চাইতে প্রাচীন ‘লৌকিক ও অসাম্প্রদায়িক’ এ লাকড়ি তোড়ার (ভাঙার) উৎসব বা ‘লাক্কাতোড়ার উরস’ উদযাপিত হয়ে আসছে চিরাচরিত প্রথায়।

এ উৎসব হটাৎ করে শুরু হয়নি। প্রাচীন এই উৎসবের সাথে জড়িয়ে আছে সুলতানুল বাঙাল হজরত শাহ্জালাল (রহ.)-এর স্মৃতি। প্রায় সাতশত বছর ধরে হিজরি বছরের ২৬ শাওয়াল এই ‘লাক্কাতোড়ার উৎসব বা ‘লাকড়ি ভাঙার উরস’ উদযাপিত হয়ে আসছে। এই দিনটি হলো হজরত শাহজালাল (র.হ.) কর্তৃক সিলেট বিজয়ের দিন । ৭০৩ হিজরী’র ২৬শে শাওয়াল অত্যাচারী রাজা গৌড়গোবিন্দকে পরাজিত করে প্রাচিন শ্রীহট্ট নগরী সুফি সাধক হজরত শাজালাল (রহ)-এর হাতে বিজিত হয়। তাই এদিন ‘শ্রীহট্ট বিজয় দিবস’ নামেও পালিত হয়। আবার এ দিনেই ৭২৫ হিজরিতে হজরতের মামা ও মুর্শিদ হজরত সৈয়দ আহমদ কবির (রহ.)-এর ওফাত হয়। পিতৃ-মাতৃহীন হজরতশাহজালাল (রঃহঃ) শৈশবকাল মামা হজরত সৈয়দ আহমদ কবির (রহ.)-এর কাছে লালিতপালিত হয়েছিলেন। তিনি ভাগনেকে শুধু লালন-পালনই করেননি আধ্যাত্মিক শিক্ষায়ও শিক্ষিত করেন। কামালিয়াতের উচ্চপর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ায় তিনি ভাগনেকে ইসলামের দাওয়াতে নিয়োজিত করেন। মক্কা শরিফের এক মুঠোমাটি দিয়ে বলেন এই মাটির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ স্থানেই তাঁর দাওয়াতি মিশন সমাপ্ত করতে। হজরত সৈয়দ আহমদ কবির (রহ.) ছিলেন জগত বিখ্যাত সুফিসাধক হজরত জালালুদ্দিন সুররুখ বুখারী (রহ.)-এর পুত্র ও হজরত মাখদুম জালালুদ্দিন জাহানিয়ান জাহানগাস্ত বুখারী (রহ.)-এর পিতা। ২৬ শাওয়াল হজরত সৈয়দ আহমদ কবির (রহ.) পাঞ্জাব প্রদেশের ভাওয়াল জেলার উচ নগরীতে ইন্তেকাল করেন। তাই এইদিনটি শাহজালাল (রহ.)-এর মুর্শিদের পবিত্র উরস শরীফ হিসাবেও উদযাপন করা হয়।

লাকড়ি ভাঙা উৎসবের সম্পর্কে যে কিংবদন্তী প্রচলিত আছে তা হজরত শাহ্জালাল (রহ.) এর সাথে ঐতিহাসিকভাবে সম্পর্কিত। রাজা গৌরগোবিন্দকে পরাজিত করার পর হজরত শাহ্জালাল (রহ.) তাঁর সঙ্গী সাথিদের এই অঞ্চলের নানা প্রান্তে ইসলাম প্রচারে প্রেরন করলেন। তাঁর সঙ্গীদের তিনি ছিলেন নেতা বা মুর্শিদ। তাই প্রতি বছর সিলেট বিজয়ের এই দিনে সঙ্গীও আউলিয়াগন বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছুটে আসতেন মুর্শিদের কাছে। মুর্শিদের সান্ন্যিদ্ধে এসে সিলেট বিজয়ের এই গৌরবের জন্য আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞতা জানাতেন।

সিলেট বিজয়ের পর প্রায় প্রতি বছর এ বিজয় দিবস মহাসমারোহে উদযাপিত হতো। নানা অঞ্চল থেকে আউলিয়ারা আসতেন হজরতশাহজালালের (রহ.) এর দরবারে। এরূপ এক বছর বিজয় দিবস উদযাপনের কিছুদিন পূর্বে হযরতের কাছে এক নও-মুসলিম কাঠুরে এক ফরিয়াদ নিয়ে এলো । কাঠুরের ফরিয়াদ হল- তাঁর বিবাহযোগ্যা ৫ মেয়ে আছে । কিন্তু সে অত্যন্ত দরিদ্র ও নিচু জাতের মানুষ বলে মেয়েদের জন্য কোনও বিবাহ আলাপ আসেনা। কাঠুরে হযরতের কাছে এ দুর্ভাবনার প্রতিকার চান। হজরত কাঠুরের ফরিয়াদে অত্যন্ত বেদনাহত হলেন। তিনি কাঠুরেকে কিছুদিন পরে ‘সিলেট বিজয়ের দিন’ এর প্রতিকার করবেন বলে আশস্থ করলেন। সিলেট বিজয়ের দিন বরাবরের মতো সবাই সমবেত হলে সঙ্গীগণসহ হজরত শাহজালালের (রঃহঃ) জোহরের নামাজ আদায় করলেন । নামাজ শেষে তিনি কুড়াল হাতে করে পাহার-টিলা ব্যষ্টিতো (বর্তমান লাক্কাতোড়া চা বাগানের নির্ধারিত টিলা) উত্তর প্রান্তের গভীর জঙ্গলের দিকে যেতে থাকলেন। সঙ্গিরা তাকে অনুসরণ করতে থাকেন। এক জায়গায় এসে তিনি নিজ হাতে লাকড়ি সংগ্রহ করতে লাগলেন। মুর্শিদের অনুশরন করতে থাকলেন শিস্যরা। প্রত্যেকেই সংগ্রহ করলেন লাকড়ি। লাকড়ি সংগ্রহের পর হজরত মোরাকাবায় (ধ্যান) বসলেন।

মোরাকাবা শেষে হজরত শাহজালালের (রহ.) উপস্থিত সবাইকে অশ্রুসিক্ত নয়নে জানান কিছু সময় পূর্বে ‘উচ শরিফে’ তাঁর মামা ও মুর্শিদ সৈয়দ আহমদ কবির (রহ.)-এর ওফাত হওয়ার কথা। তিনি সমবেতদের নিয়ে স্বীয় মুর্শিদের জন্য ফাতেহা পাঠ করেন। এরপর লাকড়ি কাধে করে নিয়ে সঙ্গিদেরসহ ফিরে আসেন নিজ আস্তানায়। লাকড়ি এক জায়গায় স্তুপ করে রেখে দেয়া হয়। এরপর সমবেতদের নিয়ে আসর নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে তিনি সঙ্গিদের কাছে জানতে চাইলেন, আজ আমরা কি কাজ করেছি? উপস্থিতরা বলেন, হজরত আমরা আজ লাকড়ি ভেঙেছি।

তিনি তখন বলেন যারা লাকড়ি ভাঙে তারা যদি কাঠুরে হয় তবে আজ থেকে আমরাও কাঠুরে কারন আজ আমরাও লাকড়ি ভেঙেছি। এরপর তিনি সমবেতদের কাছে ইসলামের সাম্যের বানী ও শ্রমের মর্যাদার কথা তুলে ধরেন ও গরিব কাঠুরের ফরিয়াদের কথা জানান। তখন সমবেতদের মধ্য থেকে অনেকেই কাঠুরের কন্যাদের বিয়ে করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। কাঠুরে এবার আগ্রহিদের মধ্য থেকে উপযুক্ত পাত্র বাছাই করেন। এই বিজয় উৎসব পালনের ২১ দিন পর হজরত শাহজালাল (রহ.) এর ওফাত হয়। মুর্শিদের দেহান্তরের সংবাদে দূরদূরান্ত থেকে মুরিদ ও ভক্তরা সমবেত হতে থাকলেন। এই সমবেত মানুষের খাবার রান্নায় এই লাকড়ি ব্যবহার করা হয়। এই স্মৃতির ধারাবাহিকতায় শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও আভিজাত্যের গৌরব ধ্বংস করার জন্য এই ‘লাকড়িতোড়ার প্রথা’ পালন করে যাওয়া অব্ব্যহত থাকে ।

সিলেট বিজয়ের ফলে যে হজরত শাহজালাল (রহ)-এর মাধ্যমে এই অঞ্চলে ইসলামের বিজয় নিশান উড়েছে সেই ‘শাহজালাল’-এর ওফাতের পর হটাৎ করে কেউ তাঁর নামে এমন একটি অনুষ্ঠান শুরু করবে এটা ঐতিহাসিকভাবে নির্ভরযোগ্য নয়। হয়তো তখন যা সুশৃঙ্খল কুচকাওয়াজ ছিলো এখন তা হাজার মানুষের মিছিল। তখনো কুচকাওয়াজের রীতিতে যে ‘নাকাড়া’ বাজতো এখন তাঁর সাথে যুক্ত হয়েছে ঢোল-ডঙ্কা। তখন সেই কুচকাওয়াজে অংশ নিতো শুধু তাঁর সঙ্গী আউলিয়া ও সৈনিকরা। এখন নানা জাতি-ধর্ম-বর্ণের মানুষ এই অনুষ্ঠানে অংশ নেয়।

জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের লাকড়ি সংগ্রহের সুযোগ থাকে এই উৎসবে। পাকিস্তান আমল ও বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও এই উৎসবে পুলিশ বাহিনীর ব্যন্ড পার্টির জাকজমকপূর্ণ অংশ গ্রহণ ছিলো। কোনরূপ প্রচার প্রচারণাবিহীন প্রতি বছর এতো মানুষের সতস্ফুর্ত অংশগ্রহনে এই লাকড়ি তোড়ার (ভাঙ্গার) মেলা’ বা ‘লাক্কাতোড়ার উরস’ প্রাচীন এক লৌকিক উৎসবে সিলেট নগরীর রাজ পথকে বর্ণিল করে তোলে। এই লাকড়ি তোড়ার (ভাঙ্গার) মেলা’ বা ‘লাক্কাতোড়ার উরস’ এ জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সকলশাহজালাল (রহ.)-এর ভক্তদের অংশ গ্রহণ থাকে। এই লৌকিক ও অসাম্প্রদায়িক উৎসব সিলেটের ঐতিহ্যময় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য নজির। তপ্ত দুপুরে প্রখর রৌদ্রের মাঝে ছুটে চলা এ মিছিল যখন লাক্কাতোড়া বাগানের নির্দিষ্ট পাহাড়ে পৌঁছে তখন তৃস্নার্ত ভক্তদের জন্য কুয়া থেকে তুলে আনা ঠান্ডা জল নিয়ে অপেক্ষায় থাকে বাগানের সাঁওতাল-ওড়িয়া ছেলে বুড়োরা।

প্রতি বছর চিরাচরিত প্রথায় পালন করা এ উৎসবের কোনো উদ্বোধক নেই, প্রধান বা বিশেষ অতিথি নেই, মিছিলের সামনে দাড়ানো নিয়ে কোনো প্রতিযোগিতা নেই। দরগা ই হজরত শাহজালাল (রহ)-এর সরেকউম-মোতাওয়াল্লী ফতেহ উল্লাহ আল আমান-এর তত্বাবধানে জোহর নামাজ শেষে দরগা-ই-হজরত শাহ জালাল (রঃহ:)-এর প্রধান ফটক থেকে বের হয়ে সবাই ছুটে যাবে এ মিছিলের একজন হয়ে। আম্বরখানা-মজুমদারি-খাসদবির- চৌকিদেখি পাড়ি দিয়ে লাক্কাতোড়া চা-বাগানের নির্দিষ্ট পাহাড়ে পৌঁছে প্রথমে অনুষ্ঠিত হয় ফাতেহা-খানি । অতঃপর সবাই যার যার মতো করে সংগ্রহ করে লাকড়ি। সেই লাকড়ি কাঁধে নিয়ে আসর নামাজের পূর্বেই ফিরে আসে দরগা প্রাঙ্গণে। লাকড়ি কাঁধে নিয়ে হাজার হাজার মানুষ যখন রাজপথ ধরে শহরে ফিরতে থাকে তখন দূর থেকে দেখে মনে হয়, অরণ্য বুঝি নগরের দিকে হেঁটে আসছে। দরগায় পৌঁছে এ লাকড়ি প্রথমে দরগা পুকুরে ধুয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় সব জমা করে রাখা হয়। লাকড়ি ভাঙ্গার এই উৎসবের ২১ দিন পর অনুষ্ঠিত হয় হজরত শাহ জালাল (রহ.)-এর পবিত্র উরস শরীফ। এই দিন থেকে উরস শরিফের প্রস্তুতি পর্ব শুরু হয়ে যায়। প্রতিবছর উরসের শিন্নি রান্নায় ব্যবহার করা হয় এই লাকড়ি।

এই উৎসবের সম্পর্কে দেশবাসী দূরে থাক সিলেটের অধিকাংশ মানুষেরও কোনও ধারনা নেই। এ ধরনের একটি ঐতিহ্যময় প্রাচীন উৎসব এ অঞ্চলের পর্যটনকে সমৃদ্ধ করতে পারে। সাত শত বছর প্রাচীন এই উতসবকে দেশের জাতীয় পত্রিকাগুলো দূরে থাক স্থানীয় পত্রিকা গুলোও গুরুত্ব দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করে না। এ সম্পর্কে ৮/৯ লাইনে সিঙ্গুল এক কলাম খবর থাকে ‘লাকড়ি তোড়ার (ভাঙার) মেলা বা লাক্কাতোড়ার উরস উদযাপিত’। ব্রিটিশ আমল ও পাকিস্তান আমলে এই উৎসবে পুলিশ বাহিনির ব্যন্ড-পার্টির অংশগ্রহণ থাকতো।

সিলেটের অভিজাত পরিবারের মানুষের অংশ গ্রহণ থাকতো। নাকাড়া বাজিয়ে ঘোষণা দেয়া হতো-

শাহ ফিরোজ, সুলতানে আকবর
কাতিলে কুফফার শাহ সিকান্দার
শাহজালাল পীর দস্তগীর
শাহে আলম সৈয়দ আহমদ কবীর।

বর্তমানে প্রতিক্রিয়াশীলরা ‘বেদাত’ ‘শিরক’ বলে এই উৎসবের নিন্দা করে। আবার প্রগতিশীলরা ‘ইসলাম সংশ্লিষ্ট’ বলে এই ‘লৌকিক’ ও ‘অসাম্প্রদায়িক’ উৎসব থেকে দূরে সরে থাকে। তবে এই উৎসবের সম্পর্কে অবগত হলে- আগামীতে দেশ-বিদেশের পর্যটকরা এ উৎসবে যোগদান করবেন।

লেখক, সমন্বয়ক-সিলেট বিভাগের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি ও প্রকৃতি রক্ষা পরিষদ।