প্রচ্ছদ

-শেষ পর্ব
বিশ্বব্রহ্মাভ

16 July 2019, 17:54

শুভ প্রতিদিন

আজিজুস সামাদ আজাদ ডন.
এস্কেটোলজির মত একটি বিষয়ে আলোচনা করে যত ভাবেই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হোক না কেন, বিষয়টি আরও দুর্বোদ্ধ হয়ে পরবে। কিন্তু তারমানে এই নয় যে এস্কেটোলজি অপ্রয়োজনীয়। কেউ যদি ভাবেন যে বাতাসের বাধাটুকু না থাকলে প্লেনের গতি আরও অনেক বেশী হতে পারতো, তারা আসলে ভুলেই যান যে, প্রাথমিক ভাবে প্লেনটি উড়বার সক্ষমতাটুকু পেয়েইছে বাতাসের বাধার কারণেই।

টাইম টানেলে আবদ্ধ সৃষ্টির মহাশুন্যতার মাঝেও ইতিহাসের কিছু সন্ধিক্ষণ আছে বলে আমার মনে হয়, যেখানে এসে সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক নির্ধারিত সিদ্ধান্ত একটাই দেয়া থাকে, যেখানে এসে সৃষ্টির দ্বারা সংগঠিত ভুল কর্ম গুলোর কারণে এই মহাবিশ্বে সৃষ্ট অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা সমুহের সমন্বয় সাধন করেন সৃষ্টিকর্তা। ধর্মীও উদাহরণের কাছেই এই কথার সবচেয়ে বড় সত্যতা পাওয়া যাবে। আর সব সবকিছুই গুরুত্বহীন।

ইতিহাসের সন্ধিক্ষণের কয়েকটি ঘটনাবলীকে তুলে ধরা যাক।
১) হিটলার যদি যুদ্ধে জয়ী হত।
২) আলাউদ্দিন খিলজি যদি পরাজিত হত।
৩) আলেক্সেন্ডার যদি এতো অল্প বয়সে মারা না যেতেন।

এসবই ইতিহাসের পাতায় শোভাবর্ধনকারী কিছু নাম ও ঘটনা যা শুধুমাত্র আমাদের টাইম-টানেলের সেই কালের জন্যই প্রযোজ্য। এখানে অন্য রকম কিছু ঘটলে মানব ইতিহাসের চুড়ান্ত ভবিতব্যে কি এমন ঘটতো। কিছুই না। ফেরাউন থেকে শুরু করে কত শক্তিশালী শক্তি মাত্র কয়েক হাজার বা কয়েকশো বছর পরে এসে মানব সভ্যতার পরিনতিতে দূরে থাকুক, বর্তমান টাইম-টানেলেই বা কি ভূমিকা রাখতে পেরেছে। খুব সহজ ভাবে বোঝার জন্য শুধু হিটলারের কথাই ধরা যাক। অষ্ট্রো-হাঙ্গেরীর প্রিন্স ফার্দিনান্দের ড্রাইভার যদি দৈবক্রমে ভুল রাস্তায় গাড়ি না নিয়ে যেত তবে প্রিন্সের আততায়ীর সামনে পড়বারও কোন কারণ থাকতো না, প্রথম বিশ্বযুদ্ধও হয় তো ঐসময়ে শুরু হ’তো না, আর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ না হলে হিটলারও সৃষ্টি হ’তো না এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধও হয় তো হ’তো না। যদি এই ঘটনা এবং মানুষ গুলোর মানব ভবিতব্য নির্ধারনে কোন ভূমিকা রাখার কারণ থেকে থাকে তবে হয়তো এর বিপরীতে এমন অন্য কোন কিছু ঘটতো, যে কারণে অবশ্যই এই ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতো। নাম বা ঘটনা এখানে মূল বিষয় নয়।

এস্কেটোলজি নিয়ে কথা বলতে গেলে ভবিতব্য শব্দটি গোলমালের মধ্যে ফেলে দেয়। টাইম টানেলেই যদি সব আবদ্ধ থাকে তাহলে আমার বর্তমান কর্মের মূল্য কি হতে পারে। মানব জাতির ভবিতব্যের সাথে সাথে তো আমারও ভবিতব্য টাইম টানেলে লেখা হয়েই আছে। ফ্রি উইল তো এখানে খুব সামান্যই প্রভাব ফেলে। নাহ, ঠিক নয়। মানবতার ভবিতব্য এবং একটিমাত্র মানুষের ভবিতব্য, দু’টি আলাদা বিষয়। এই মহাবিশ্বের শেষ পরিনতি, স্রষ্টার প্রতিটি প্রতিটি সৃষ্টির উপর নির্ভরশীল, আর একটি মানুষের কর্ম সেই মানুষের শেষ পরিনতির ফল বয়ে আনে। এই লেখায় এই বিষয়ে বড় পরিসরে আলোচনা সম্ভব নয়। এস্কেটোলজির উপর আমার আগের দু’টি লেখায় এই বিষয়ে কিছু আলোচনা করেছি।

এস্কেটোলজিতে দেহতত্ত্ব আলাদা একটি বিষয় এবং এই বিষয়ে এই লেখাতেই কিছু আলোচনা করেছি। একটি মানুষের দেহ ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন কোষ দিয়ে তৈরী এবং আমরা আগেই বলেছি, যে ভাবেই হোক প্রতিটি কোষ এবং বহু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নিজস্ব পরিচালন ক্ষমতা ও ঘুর্ণনই বলি আর অন্য যে ভাবেই হোক শক্তি উৎপাদন ক্ষমতা আছে। তারপরেও সামগ্রিকতা আনার লক্ষে তাদেরকে একটি ঐক্য সূত্রে বেঁধে দেয়া হয়েছে। সেই ঐক্য সূত্রের কম্পনাঙ্ক খুঁজে বের করার চেষ্টাই এই মহাবিশ্বে আমাদের অবস্থানের “মোক্ষ”।

ঠিক একই ভাবে মানুষও সমাজবদ্ধ ভাবে বাস করে। এবং বিভিন্ন সমাজের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট গড়ে ওঠে হাজারো বছরের পথ পরিক্রমায়, ধর্ম, ভাষা, গায়ের রঙ ইত্যাদি বহু কিছুর সমন্বয়ে। বিভিন্ন সমাজের এই বৈচিত্রতা মেনে নিয়েই, আমরা সমাজের মাঝে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি না ক’রে, সমাজের আইন কে চ্যালেঞ্জ না ক’রে, তার সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলি। কিন্ত আমরা আগেই আলোচনা করেছি, আবেগীয় মাত্রার তৃতীয় স্তরে কল্পনার বিপরীতেই রয়েছে প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা। এই প্রশ্নের কারণে, যে কোন “আমি”, যে কোন টাইম টানেলের যে কোন পর্যায়ে, যে কোন কিছু সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষণের প্রতিটি মুহুর্তের সিদ্ধান্তই মানবতার ভবিতব্যে ভূমিকা রাখবে।

এখন একটা প্রশ্ন মনে ঘুরপাক খেতেই পারে, এইসব প্রশ্নের উত্তর তো সীমিত স্বাধীন চিন্তার প্রেক্ষাপটে আমার বর্তমান টাইম টানেলের জন্যই শুধুমাত্র প্রযোজ্য। উত্তর গুলো পেলে আমার বর্তমান টাইম-টানেলের মানব ইতিহাসের ভবিতব্য কতটুকু উপকৃত হবে বা আমার নিজের ভবিতব্যে কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারবে। এই বিষয়ে আমার আমার ভাবনা একটি ক্ষুদ্র গন্ডিতে আবদ্ধ। প্রশ্নগুলো আসলে আমাদের টাইম-টানেলের নিস্তরঙ্গ অথচ বহমান একটি জলধারার মাঝে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রস্তর ক্ষন্ড মাত্র। কোন “আমি” যদি মনে করে যে, যেহেতু আমার যাপিত জীবনের জন্য এই “প্রশ্ন” গুলোর উত্তর অপ্রয়োজনীয়, তবে অবশ্যই সে একটি নিস্তরঙ্গ জীবন কাটিয়ে দিতে পারবে কিন্ত ‘মোক্ষ” সাধনে “আমি”র ভূমিকা হারিয়ে যাবে জলরাশির মাঝে।

এখানে একটি উদাহরণ দেবার লোভ সংবরন করতে পারলাম না। সেকেন্ডে চব্বিশটী ফ্রেমে আবদ্ধ কিছু স্থির চিত্রের সমন্বয়ে দুই ঘন্টার একটি ভাল মুভি দেখে আসার পর আমরা কি বলতে পারবো ৬০সেকেন্ডী৬০মিনিটী২ঘন্টাী২৪ফ্রেমের=১,৭২,৮০০ ফ্রেমের মাঝে কোন ফ্রেমটি আমার বিশেষ ভাল লেগেছে। আমার পক্ষে অন্তত সম্ভব না। সুতরাং, মানবতার এস্কেটোলজিতে “আমি” এর ভূমিকা নির্ধারনে, টাইম টানেলের যে কোন অবস্থানে যখনই “আমি” এর সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষণটি উপস্থিত হবে, তখনই “আমি”কে আগে থামতে হবে, আবেগ আর যুক্তির ঐক্যের সূর-তাল-অনুরননকে ঐক্যবদ্ধ করে প্রশ্ন করতে হবে, কোন সিদ্ধান্তটি এই ক্ষনে, এই টাইম টানেলের জন্য নায়কোচিত সিদ্ধান্ত হবে, বাকিটুকু “আমি” এর বিষয় নয়, সব শুন্যের খাতায়।

আসলে থিয়োলজি কখনোই কোন কিছুই নিশ্চিত ভাবে বলতে পারে না। তবে এস্কেটোলজি ভাবনা কখনোই কোন গুপ্ত বিদ্যা নয় যে, একটি শব্দ বা একটি বাক্য বা একটি বই না বুঝে বারেবারে জপলেই যাদুর মত কাজ করবে। এই ভাবনা চলমান, এই ভাবনা বিশ্বাসের, এই ভাবনা চর্চার। অতএব, লেখাটির আপাত শেষ টানি কিছুটা অনিশ্চয়তা দিয়েই।

আমাদের পৃথিবী প্রায় ৩৬৫ দিনে একবার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। সে কারণেই আমাদের পৃথিবীতে কোথায়ও ছয় ঋতু আবার কোথায়ও বা চার ঋতু। পৃথিবীর নিজস্ব ঘুর্ণয়নে তৈরী হচ্ছে দিন-রাত্রি। আর চন্দ্রের প্রায় ত্রিশ দিনে পৃথিবীকে প্রদক্ষিনের কারনে পৃথিবীর বুকে তৈরী হচ্ছে জোয়ার-ভাটা। তথাকথিত (বারেবারে তথাকথিত শব্দটি উচ্চারন করছি, কারণ, আমি বিশ্বাস করি আমরা চতুর্মাত্রিক বিশ্বে বসবাস করছি) সমগ্র ত্রৈমাত্রিক মহাবিশ্ব পরিচালিত হচ্ছে একে অপরের মধ্যাকর্ষন শক্তি ও ঘুর্ণন বা প্রদক্ষিনের ব্যালেন্সড শক্তির মধ্য েিদ্য। পরবর্তি মহাবিশ্বও হয়তো একই নিয়মে পরিচালিত হচ্ছে বা অন্য কোন নিয়ম আছে সেই মাত্রা বিহীন মহাবিশ্বে। কিন্ত আমাদের এই তথাকথিত ত্রৈমাত্রিক মহাবিশ্বে আমাদের সূর্য প্রতি সেকেন্ডে ২২০ কলোমিটার গতিতে, প্রায় সাড়ে বাইশ কোটি বছরে আমাদের গ্যালেক্সির কেন্দ্রবিন্দুকে প্রদক্ষিন করে চলেছে। তাহলে এই মহাবিশ্বের জোয়াড় ভাটা বা মহাবিশ্বের ঋতু পরিবর্তন নিয়ে অথবা মানবতার ভবিতব্য নিয়ে আমরা কতটুকুই বা আর আলোচনা করতে পারবো।

সুতরাং, অতি ক্ষুদ্র জ্ঞান থেকেও এটুকু বলা যায়, সৃষ্টির রহস্যের সমাধান পেতে আমাদের জ্ঞান অনুযায়ী যখন যতটুকু যাওয়া সম্ভব পথ চলতে হবে। এগিয়ে যাবার সাথে তাল মিলিয়ে ভবিতব্যের শেষ সীমানা দিগন্ত রেখার মতই হয়তো আরও আরও দূরে সরে যেতে থাকবে, তারপরেও পথ বেয়ে এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের যেতে হবে বহুদূর, মানব ইতিহাসের ভবিতব্যের কাছে। আমি মনে করি, স্রষ্ঠার সৃষ্টির যন্ত্রনাদায়ক প্রসব যন্ত্রননার পূর্বেও ছিল পরিপূর্ণ নিস্তব্ধতা ও শুন্যতা এবং ভবিতব্যও নির্ধারিত আছে প্রচণ্ড যন্ত্রনার পর পরিপূর্ণ প্রশান্তিময় নিস্তব্ধতা ও শুন্যতা।

আমার এস্কেটোলজিক ভাবনার দ্বিতীয় পর্বের সমাপ্তি টানবার আগে দুটি কথা বলতে চাই। এই বিষয়ে প্রথম লেখা “গন্তব্য, শেষ গন্তব্য, ভবিতব্য”। ঐ লেখার পর থেকে আমি এস্কেটোলজির উপর তথ্য-উপাত্ত জোগাড় ক’রে একটি চুড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাবার চেষ্টা করেছি এবং চলমান সব ঘটনার বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছি এস্কেটোলজি দিয়ে। “বিশ্বব্রহ্মাভ” লেখা শুরু করার আগেই আমার ধারণা জন্মেছিল যে, এতো তথ্য-উপাত্ত আমার ভাবনায় জটিলতা সৃষ্টি করবেই। সেকারণে প্রথম থেকেই লেখাটি আমি কেন লিখছি এবং আমি কোথায় পৌঁছাতে চাইছি সেটা আগে ঠিক করার চেষ্টা করেছি।

আমার লেখার উদ্দেশ্য ছিল, লেখতে লেখতে কোন কারনে শর্টকাটে ভবিতব্যে পৌঁছানোর পথ খুঁজে বের করা। মানুষের শক্তি কেন্দ্র গুলোর মাঝে যদি একটি ঐক্য গড়ে তোলা যায়, তাহলে কি আমরা শর্টকাট রাস্তাটি খুঁজে পেয়ে যাবো কিনা। এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত, ফলো দা ইউজার ম্যানুয়াল।

তবে, লেখা শুরু করার পর আমার লক্ষ পরিবর্তিত হ’য়ে নতুন মোড় নেয়ায় কিছু যায়গায় শেষ পর্যন্ত সত্যিই ভাবনাজট তৈরি হয়েছে। বিষয়টি আর কিছু নয়, আমার মনে হয়েছে আমরা ত্রিমাত্রিক নয় চতুর্মাত্রিক মহাবিশ্বে আছি, যেখানে “সময়” নামের আরও একটি মাত্রা কাজ করছে কিন্তু আমাদের ব্রেইন এই মাত্রাটিকে বুঝতে ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত ভাবে বাধার সৃষ্টি করছে। অনিচ্ছাকৃত বলার কারণ একটাই, “সময়” নামের মাত্রাটি এই মহাবিশ্বে কোন একটি বস্তুর অবস্থানজনিত প্রেক্ষাপটে মহাশুন্যে আলোর গতির উপর নির্ভরশীল এবং মহাশুন্যে আলোর গতি বুঝবার প্রচেষ্টার মাত্র প্রথম সোপানে আমাদের বর্তমান অবস্থান।

আমি তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে যেটুকু বুঝতে পেরেছি, স্রষ্টার সৃষ্টির তুলনায় শুধু নয়, মহাবিশ্বে আমাদের সত্যিকারের অবস্থান শুন্য। সুতরাং, শুন্য কোন কিছুর কোন ক্ষমতাই নাই তার শুন্যতার ভবিতব্য নির্ধারনী চিন্তা ভাবনার শেষ সোপানে পৌঁছাবার।
শেষ কথা, সম্পুর্ন ডিভোশন না থাকলে এই ধরনের একটি বিষয়ে লাইনচ্যুত হওয়া খুব সহজ। সম্পুর্ন ডিভোশনে আমার আপত্তি নেই কিন্ত আমার মনে হয়েছে, এই বয়সে এসে, এই ধরনের বিষয় নিয়ে নাড়াচাড়া ক’রে একটিই অর্জন সম্ভব, একজন পাঠকেরও যদি ভাবনার দূয়ার খুলে দেয়া যায়। -শেষ

লেখক বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও কলামিস্ট। (দেশের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদের জ্যেষ্ঠ ছেলে)।