প্রচ্ছদ

ইন্টারনেট আসক্তিতে সিলেটের শিক্ষার্থীরা : উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সচেতনতামূলক কর্মশালার আয়োজন করার আহবান’

২৫ অক্টোবর ২০১৯, ১৮:০১

মবরুর আহমদ সাজু

মুঠোফোনে কেন এতো আসক্তি-এর কোনো সদুত্তর মিলেবে না এই প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের কাছে। দিনের সিংহভাগ সময় মুঠোফোনে পার করে দেয় অনেকে। তথ্যপ্রযুক্তির ছোয়ায় বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে। সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে সাথে উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে আসক্তি ছড়াচ্ছে। স্মার্টফোন ছাড়া একদিনও কল্পনা করতে পারছেন না তারা। ফেসবুক-ইন্টারনেট ব্রাউজিং, গেমস খেলাসহ বিভিন্নভাবে দিনের সিংহভাগ সময়ই কাটে স্মার্টফোনে। এই আসক্তি ছড়িয়ে পড়েছে সিলেটের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মাঝেও। মোবাইল ফোনের খারাপ দিকগুলোতে চরমভাবে আসক্ত হচ্ছেন তারা।

এতে পড়ালেখা থেকে মনযোগ কমছে তাদের। নিয়ন্ত্রণ করতে হিমসিম খাচ্ছে অভিভাবকরা। ইন্টারনেট থেকে শিখে অনেকেই ছোটখাটো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। অপরদিকে স্কুল কলেজে যাবার পথে হেড ফোন ব্যবহারের কারণে দুর্ঘটনার শিকারও হচ্ছেন অনেকে। বিষয়গুলো নিয়ে সিলেটের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ মোবাইল ফোন ব্যবহার রোধে কঠোর হলেও হতাশ হতে হয় অনেক ক্ষেত্রে।

মোবাইল কোম্পানীর একটি পরিসংখান বলছে, দেশে মোবাইল গ্রাহক ১২ কোটি ৬০ লাখ, তার মধ্যে ফেইসবুক ব্যবহারকারির সংখ্যা ৫ কোটি। ফেসবুক ব্যবহারকারিদের মধ্যে অধিকাংশই অপ্রাপ্ত বয়স্ক। ইন্টারনেট ব্যবহার নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ধর্মীয় শিক্ষকরা মনে করেন পারিবারিক বন্ধন আর ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিটি পরিবার থেকেই রাখতে হবে সেই সাথে প্রয়োজন বুঝেই শিক্ষার্থীদের হাতে মোবাইল দেওয়া যাবে কিনা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ বিষয়টি নিয়ে সিলেট নগরীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা জানান শিক্ষার্থীদের মোবাইল ব্যবহার নিষিদ্ধ, এছাড়াও আমার প্রতিষ্ঠান অভিভাবকদের সাথে শিক্ষার্থীদের নানান বিষয় নিয়ে আলোচনা করে থাকে।

মনোবিজ্ঞানী ও গবেষকরা বলছেন, একান্ত ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতি যারা শেয়ার করেন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্ধুদের সমবেদনা দিয়ে থাকেন এ ব্যাপারে উভয়ই অতিমাত্রায় ফেসবুক বা যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্ত। সপ্তাহে ৩৮ ঘণ্টার বা এর বেশি যারা সামাজিক মাধ্যমে ডুবে থাকেন তাদের আসক্তি বলা যায়। মাদক ছাড়া যেমন অনেকে থাকতে পারেন না, সেরূপ ইন্টারনেট বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছাড়া থাকতে পারেন না।

ইন্টারনেট ভিত্তিক টেকশহরের ওয়েবসাইট বলছে, দেশে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ৪৯ শতাংশ সপ্তাহের প্রতিদিন কমবেশি ইন্টারনেট ব্যবহার করে। সপ্তাহজুড়ে স্কুল ও কলেজের এসব শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছেলেদের দৈনিক ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ৫৩ শতাংশ ও মেয়েদের হার ৩৩ শতাংশ। এতে দেখা যায়, সপ্তাহের প্রতিদিন নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে খুলনা অঞ্চল সবচেয়ে এগিয়ে। এখানকার ৬৭ শতাংশ স্কুল ও কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা সপ্তাহজুড়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করছে।

সাহেদ নামের এক ইন্টারনেট ব্যবহারকারি বলেন, আমি সারাদিন প্রায় সারাদিনই তার মোবাইলে ডুবে থাকি। কখনও ফেসবুক, কখনও কথা বলা আবার কখনও ইন্টারনেট ব্যবহার করে।

৬০ বছর বয়সী কামরান তালুকদার বলেন, আজকালের ছেলে-মেয়েদের যে কী হলো-সব সময়ই মোবাইলে পড়ে থাকে। আমরা যখন ছোট থেকে বড় হয়েছি, তখন খেলাধুলা করতাম, ঘুরতে যেতাম, বন্ধুরা মিলে হৈ-হুল্লোর করতাম। কিন্তু বর্তমান সময়ের ছেলেরা খেলাধুলা করে না, তারা আড্ডা দেয় কিন্তু এর মধ্যেও মোবাইলে ডুবে থাকে।’

তিনি বলেন, ওই বয়সে আমরা জীবন-জীবিকা, জীবনের নানা পরিকল্পনা নিয়ে অনেক কিছু ভাবতাম। গল্প-উপন্যাস পড়তাম। কিন্তু এখনকার ছেলে-মেয়েরা আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের মাঝে থাকলেও ফোনে আসক্ত থাকে বেশি। তাদের ইনোভেটিভ কিছু চিন্তার ক্ষমতা দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। মাত্রাতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারের ফলে এমনটি হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) সিলেট কেন্দ্রের ইনচার্জ মধুসূদন চন্দ বলেন, ফেসবুকের আসক্তি কমাতে স্কুলে স্কুলে সচেতনতা-প্রচার শুরু করলে তরুণ প্রজন্মকে ওই কুপ্রভাব থেকে রক্ষা করা যাবে। এক্ষেত্রে স্কুলগুলোতে কর্মশালার আয়োজন করা যেতে পারে। কর্মশালায় ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার কুফল নিয়ে আলোচনা ও পাঠচক্র করা যেতে পারে।

তিনি বলেন, ইন্টারনেটের কুফল থেকে সন্তানদের বাঁচাতে বিকল্প হিসেবে খেলাধুলা বা পরিবারের সদস্যদের সময় দেয়া একান্ত প্রয়োজন। প্রতিদিন বিকেলে পড়া শেষে তাকে খেলাধুলার সময় দিতে হবে। শিশুদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।

এ বিষয়ে সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর হায়াতুল ইসলাম আকঞ্জি বলেন, ‘আমাদের বাচ্চারা বর্তমানে ক্রিয়েটিভ কোনো চিন্তা করে না। নতুন প্রজন্ম সারাক্ষণ স্মার্টফোনে ডুবে থাকে। আগে বাচ্চারা প্রচুর ছোটাছুটি ও খেলাধুলা করতো। কিন্তু এখন স্মার্টফোন অ্যাডিকশনের কারণে শারীরিক, মানসিক ক্ষেত্রে চাপ বাড়ছে। তাদের জন্য বিকল্প বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে।’